তহবিল

কেবল আয়নার দিকে চেয়ে আছি। না, কিছুই দেখছি না তেমন। কেবল নিজের মালভূমি-মার্কা মুখখানা ছাড়া। আজই হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমার নাকটা বড্ড উঁচু। যেন গ্লোবের মধ্যে কাঁচা মাটির প্রলেপ দেওয়ার পর কোনও এক অ্যাবস্ট্র্যাকআর্টিস্ট ভারি মজাক করে এক তাল মাটি চাপিয়ে পাহাড় গড়ে দিয়েছে! কানের ঠিক উপরে আমার বাদামী ত্বক কেটে সাদা পায়েচলা পথ তৈরি করেছে নাছোড় বান্ধবী, চশমা। আরেএতক্ষণ খেয়ালই করিনি, সামনের চুলগুলোকে… কুশঘাসের মত ধারালো ভাবে খাড়া হয়ে ঠিক ঘাড়ের কাছে এসে আবার ঝুঁকে পড়েছে। অদ্ভুত তো! এতদিন যারা চুল কেটেছে খেয়াল করেনি? এবার এটাকে কী করে ঠিক করা যায় একটা পরামর্শ নিতে হবে। সকালেহাঁটা অভ্যেস করতে হবে। সামনের মাংসল উপত্যকা এভারেস্ট হয়ে উঠেছে। এভারেস্ট? চূড়ায় হাত দিই। এত গরম কেন? তুষারপাত হয়নি? ডাক্তারি কায়দায় বললাম, এতে কোনও সমস্যা হবে না। উষ্ণায়ন প্রকোপ নয়। স্নান করে নাও। বুকের কাছে হাত দিলাম। বেশ ঠাণ্ডা। এসি রুমে শব্দের স্তর, প্রায় ছুঁয়ে দেখা যায়। প্রেমের গান চলছে স্পিকারে। আহা! স্নিগ্ধতা চাপকে যায়। শাওয়ার চালিয়ে দিই।বাঁ হাতের তালুতে বডি-ওয়াশ মৃদু গন্ধ ছড়িয়ে আদর করবার অপেক্ষায়। প্রবল শব্দে শাওয়ার ক্রমশ মুছে দিচ্ছে বাজতে থাকা গান, “…দেখলো হামকো করিবসে/ আজ হাম মিলে হে নসিব সে…”


আকাশ পরিষ্কার থাকলে নাকি শীতলখুচি থেকে ভুটানের পাহাড় দেখা যায়। গাড়িতে আসতে আসতে দেবাঞ্জনদা বললো। দেবাঞ্জনদা বরানগরের ছেলে। এখানে কলেজে পড়ান। আজ পাহাড় দেখা যাচ্ছে না। আকাশ মেঘে ঢাকা। পশ্চিমে মেঘের ফাঁকফোকর দিয়েই সূর্য নেমে যাচ্ছে প্রকাণ্ড জ্বলন্ত সিগরেট মুখে। ‘এখানে খুব ভালো আকাশ দেখা যায়’। দেবাঞ্জনদা জানলার দিকে তাকিয়ে বললো। দুপাশে ধান ক্ষেত, তিন-চার দিন আগেও বর্ষার জলে ডুবে ছিলো। মাঠের পাশে কচুপাতায় এখনওপলির স্তর লেপটে আছে। কলাগাছের গোড়ার রঙ এখনও কাদাটে। প্রশ্ন করলাম,‘তোমার এখানে থাকতে প্রথমপ্রথম কষ্ট হয়নি?’ ‘শরীর খারাপ করেছিল। বাইরে খেতাম বলে। এখন বেশ লাগে’। গাড়ি হুঁশ করে চার-পাঁচটা পরিবারের জনপদ পেড়িয়ে গেল। এগুলোও বন্যার জলে ডুবেছিলো কদিন আগ পর্যন্ত। এখন বাড়িগুলোর চার দেওয়াল নগ্নতা ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে। মেঝে? জানলা দিয়ে পিছনে তাকালাম, গতিতে কয়েক সেকেন্ডে দেখলাম, কাঠের মেঝে ভেঙে ভেসে গেছে। ঘাড় সোজা করতেই রাস্তার উপর ভেজা খাট, কাঁঠাল-কাঠের ভেজা আলমারি, আধশুকনো তোষক ডাই করে রাখা। পচাগড় মোড়ের চায়ের দোকানে সকালেই শুনেছি হাসপাতাল পাড়ার পাশ দিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তা জুড়ে ভেজা তোষক আর বাতাস জুড়ে তুলোপচা গন্ধ। বিপ্লব হাসপাতাল পাড়ায় থাকে। জিজ্ঞেস করলাম, যে বাড়িগুলো ভেঙে গেছে তাদের মেরামতের ক্ষতিপূরণ আসবে না? দীর্ঘশ্বাস চেপে বললো, ‘ও কিছু আসবে না হয়ত! আসতে না আসতেই…’ প্রবল হাওয়ায় কপালের উপর আমার কয়েক গাছা চুল এসে পড়ল। এমন হওয়ার কথা নয়! সকালে বেশ করে হেয়ারজেল ঘষেছি চুলে। অখাদ্য সব এগুলো! পয়সার শ্রাদ্ধ! বলে কিনা চব্বিশ ঘণ্টা কাজ দেয়! ঢপ! উফ, কাশী হয়েছে। কাকুরও (কৌশিকের বাবা) নাকি সর্দি-কাশি হয়েছিল। এ কদিন বুকজলে ত্রাণ বিলি করেছেন। বয়স হয়েছে, এসব বোঝেন না ওঁরা! কৌশিকের থেকে জানতে চাইলাম আজ কি ভারত-শ্রীলঙ্কার ম্যাচ আছে? কৌশিক খেলা দেখে না। আমিও দেখি না। চ্যাম্পিয়ান ট্রফিতে পাকিস্থানের কাছে হারটা এখনও হজম হয়নি।


আজকাল পরিশ্রান্ত হয়ে উঠলে মুখেরবাঁদিকটা ফুলছে। প্রথমে ভেবেছিলাম আয়নাটার গোলমাল। দু-তিনটে আয়না ঘুরে কনফার্মডমুখ ফুলছে। এর একটা ট্রিটমেন্ট দরকার। পিছনের টিভিতে মুখ্যমন্ত্রী ‘রাইজিং বেঙ্গল’-এর খতিয়ান তুলেতুলে ছুড়ছেন… কে জানে কার মুখে!আয়নায় সব উলটো হয়ে যায়। মুখ বুঝতে পারছি না। কাকু পেপার পড়ছেন। ফ্রন্টপেজ। বুকজলে দিনাজপুরে ত্রাণ নিচ্ছে চাষাভুষোরা। ফেসবুক ওয়ালে নেতাজীইন্ডোরে দেব-জিৎ-এর সাথে মাননীয়ার ছবি, নতুন কবিতা লিখেছে কেউ কেউ, ঘুরতে এসেছি বনে/ সেলফি তুলি জলে, ফাঁকতালে কে যেন বন্যা ত্রাণের আবেদন জানিয়েছেন। কমেন্টে একজন লিখেছেন ট্যাক্সের টাকার একটা অংশ নাকি এই সব ন্যাচারাল ক্যালামিটিসের জন্য যায়, সে ফান্ড কোথায়? কে জানে বাবা, ট্যাক্স দিয়েদিয়েছিগপ্প শেষ। এবার ট্যাক্স জলে যাবে না, কারও ঘরে যাবে সে সরকার বুঝবে! মনটা খুঁত-খুঁত করছে, মুখটা ফুলছে কেন?


এতটা লিখে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। কোথাও কাব্যি করিনি তো? দরদী হতে হবে লেখাটা। বুড়ো নীল আঙুলের হাততালি দরকার। এখানে এসেই পেনের নিবটা একটা চক্কর কেটে এলো। দায়-দায়িত্ব-মনুষ্যত্ব… থাম বাপ আমার! বৃষ্টি আমার জন্য হয়নি, নদীকে আমি বাঁধিনি, ভুটান আমার জন্য জল ছাড়েনি, তোমাদের ত্রাণ আমি খেয়েও নিইনি। ঘর গেছেআবারগড়েও নেবে। টাকা নেই, তো? মহাজন আছে। ক্ষেত গেছে, ভিক্ষে কর। দরকারে আত্মহত্যা। আমার এসবে দায় নেই। আমি কেবল নির্মেদ গদ্য লিখবোআর মাছের পেটিখানা থেকে মাংস খুবলে খেয়ে পেটিএমে যদি কিছু থাকে পাঠিয়ে দেব কোনও ‘বন্যাত্রাণ তহবিল’-এর অ্যাকাউন্টে।


আজ মাছের ঝোলটা বেড়ে হয়েছিলো। 


ছবি ঋণ: বিপ্লব সরকার (মাথাভাঙ্গা)

পিতা জন্ম

‘আসছি!’ বলে চটিটা পায়ে গলালেই গলার কাছে একটা কান্না চেপে বসে। তুমি বলবে অকারণ! তবু কান্না এসব যুক্তি মানবে কেন? সে গলার কাছে অবরোধ করেই রাখে। বার কয়েক বেশ জোরে খুক খুক করতেই হয়, না হলে সে পথ ছাড়বে না। আসলে তারও তেমন দোষ নেই, সে বেচারাও করবে কি! তোমাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে এই ভাবনাই মনের সমস্ত কিছু দিয়ে আপনা থেকেই অবরোধ করতে থাকে। সকালের তোমার আঁচলের সেই, সর্ষের-তেল-হলুদ-নুন মেশানো গন্ধটাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য তো এখনও প্রস্তুত নই আমি! রাতে আধো ঘুমের ঘোরে মুখের সামনে মুখ এনে আমাকে অ-নেশাতুর প্রমাণ করবার স্পর্শ ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি সেরে ওঠা কঠিন, সে তোমার থেকে কে বেশি জানবে মা! তাই বিদ্রোহ করে ওঠে মন, অবরোধ করে কান্না। তারপর ‘তাড়াতাড়ি আসিস’ শব্দ দুটো শুনলেই অবরোধ শিথিল হয়। ফিরে আসি, তবু প্রতিদিন এই অবরোধ আর শেষে শব্দের সাথে বনিবনা করে অবরোধ তুলে নেওয়ার খেলা নেহাত খারাপ লাগে না! আনন্দ হয়। না, না আনন্দ নয় তৃপ্তি দেয়। তোমার, আমার মধ্যে থেকে যাওয়াটা আমাকে আরাম দেয়।

আসলে আমাদের অস্তিত্ব যে একলা হয় না। কত কত যুগ মিলেমিশে থেকে যায় আমার অস্তিত্বে। এই সমগ্রকে বংশ বলে ইতিহাস, আমি আলাদা করে, মা বাবা বলি। হতে পারে এই ব্লেন্ড সমান নয় আমার মধ্যে, তাই তোমাকেই সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে দেখি। হয়ত দেখতেই চাই! হয়ে উঠতে চাই তোমার মতই! তোমার মনে আছে ছেলেবেলায় খুব বায়না করলেই তুমি রেগে গম্ভীর হয়ে বলতে ‘না বলেছি যখন পাবে না’, তারপর কোনও একদিন বিকেলে আচমকা চমকে দিয়ে পাইয়ে দিতে। আচ্ছা এটায় কি তুমি তৃপ্তি পেতে? আজকাল আমিও করি এই ট্রিকটা। আমি ছেলেবেলা খুঁজে পাই না বিশ্বাস করো, আমি সে সময় তুমি হয়ে ওঠার আরাম পাই।

তোমায় কোনও দিন কাজল পড়তে দেখিনি। আসলে কাজল পড়া থাকলে কান্না ভালো বোঝা যায়। তাই কেউ কোনও দিন বোঝেনি সারাদিন সমস্ত কাজের মাঝে হঠাৎ হঠাৎ ডুকরে উঠেছ তুমি! রাতেও ডুকরে উঠলে আজ আর মনে পড়ে না বাবার আদর পেতে কিনা! বাবাকে বরাবর মনে হয়েছে নীলকণ্ঠ। আকণ্ঠ বিষ সহ্য করবার আধার। শুধু সেই সেবার আধা খাওয়া ভাতের থালায় যে ভাবে বিদ্রোহ করেছিলো তোমার অপমানে, মনে পড়ে তোমার? সেদিন আমার কিশোর বেলায় প্রথম মনে হয়েছিলো বাবা তোমাকে খুব ভালোবাসে! তবে সে ভালোবাসা পাহাড়ের মত, আগোল বড়, নরম মাটি নেই। কান্না নেই। যেদিন হাসপাতালে তোমার অপারেশন হবে ফোনের ওপারে ‘তোমার মা কেমন আছে’র স্বরটা আমাকে ঝর্নার কথা মনে পড়ালো। তবু কিন্তু আমি সেদিন ছেড়ে কথা বলিনি বাবাকে। দায়িত্ব কর্তব্যের পাঠ ভালোই শিখিয়ে দিয়েছিলাম। চুপ করে ছিলো বাবা, তুমি সবে যন্ত্রণা ভোলার ওষুধ খেয়েছো, মৃদু স্বরেই বললে, ‘আঃ চুপ কর!’ আমিও অবজ্ঞায় চুপ করে গিয়েছিলাম। তুমি বাবা দুজনেই হয়ত সেদিন অপমানিত হয়েছিলে, কিন্তু কোনও উত্তর দাওনি। কোনও কালেই কি দিয়েছো  কোনও জবাব? তাই আজকাল তোমাদের সমস্ত নিরুত্তর অপমানের দাগ কুঁচকে যাওয়া চামড়ার নিচে কালশিটে আলপনা হয়ে জেগে থাকে।

তাও আমি বাবা হতে চাইনি কোনও দিন। আমি কেবল তোমাকেই গুলে নিতে চেয়েছি নিজের মধ্যে। তোমার মত চঞ্চল হয়ে উঠতে চেয়েছি কেউ অসুস্থ হলেই, বাবার মত বাইরে থেকে উদাস হয়ে যেতে চাই না, তোমার মত স্নেহ মাখিয়ে দিতে চেয়েছি যে কোনও সন্তান (এর মত কাউ)-কে। আমার প্রতিটি আঙুলকে বিশেষ করে শেখাতে চেয়েছি সেই স্পর্শকে ধরে রাখতে, যা কপালে ছোঁয়ালেই বৃষ্টির আরাম পায়! নিজের চামড়ার ধমনীকে প্রসস্থ করতে চেয়েছি যাতে আরও, আরও অপমান এসে মিশে যেতে পারে, জমে থাকতে পারে ততক্ষণ যতক্ষণ না পর্যন্ত তা আলপনা হয়ে যায়!

কিন্তু যখন পায়ে চটি গলিয়ে বলি ‘চললাম’, কেন যে কান্নাটা গলা চেপে ধরে…? তবে কি মিশিয়ে নিতে পারিনি তোমাকে? না হলে এত ভয় কেন? কেন বাথরুমে কল ছেড়ে দিয়ে কেঁদে ফেলি? কেন রক্তে অপমান গুলতে গুলতেও উথলে উঠে আসতে চায়? কেন আমার সমস্ত স্নেহ ঢেলে দেওয়ার পর কারও মনে হয় ‘কিছুই তো পেলুম না’। কেন এ সংসারে নদী আর পলির মত মিলে যেতে গিয়ে দেখি সংসারের আড় বরাবর পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি!

আসলে কি জানো মা, তুমি আমার ইচ্ছে, কিন্তু এ জন্ম আমার পিতার। পাথর ফাটিয়ে ঝর্ণা না এলে আমায় আর্দ্র হতে নেই।

d1f151bc7f9ea268f460a5c6cd832646

প্রিয় কিরীটীদা তোমাকে…

প্রিয় কিরীটীদা,

সম্পাদক মহাশয় আদেশ করেছেন; শুনলাম আমাকেও লিখতে হবে তোমাকে নিয়ে। তোমাকে নিয়ে মানে? তুমি লোকটাকে নিয়ে, নাকি লোকটার লেখা নিয়ে! দু’বছর ধরে চেনা লোককে নিয়ে কী লিখি? দু’বছরে আড়াল সরে কি? না, সরে না। যদিও এ আমার বিশ্বাস। আর সরবেই বা কেন? আড়াল সরে গেলে, যে চমক থাকে জীবনের পরতে-পরতে, তাই তো ফসকে যাবে। জীবনে চমক থামলে চলবে কেন! তার চেয়ে দু’বছরে লেখককে চেনা সহজ, শব্দে আড়াল কিম্বা লুকিয়ে পড়াটা কঠিন, অন্তত সচেতন পাঠকের কাছে তো বটেই। ফলে লেখার কথা বলাই ভালো। এবার তুমি প্রশ্ন করতে পারো, “আরে তা-বলে চিঠি! এ তো আমার ফরমায়েশ নয়!” না, তা নয়, তুমি কেবল বার্তাবাহক, তবু কথাগুলো তোমার সাথেই সরাসরি হওয়া ভালো। কারণ, পাঠক খুব কমই এমন সুযোগ পায় যখন সে সরাসরি মনের কথাটুকু বলে ফেলতে পারে লেখকের কাছে… অকপটে।

আমি তোমার শুরুর লেখাগুলোকে স্পাইডারম্যানীয় কায়দায় ডিঙিয়ে এসে আজকের “রিফ্লেকশনস অন স্যালভেশন” নিয়ে শুরু করি কথা। কারণ, এর তৈরির প্রক্রিয়ার অন্যতম সাক্ষী কেবল আমিই হয়ত। আর সাথে ওই লেখাগুলোকে বাংলায় অনুবাদের চেষ্টা করেছিলাম বলে। না, না, ভয় নেই জ্ঞান দেবো না, ঢাকও পেটাবো না। আসলে, কিছুদিন আগে শুনলাম একজন পণ্ডিত-মানুষ বলছেন, আজকের এই ধর্মবিরূপতার যুগে (সাথে ধর্মকে নিয়ে সন্ত্রাস তৈরির পরিবেশে) তুমি সাহস দেখিয়েছ আবার ধর্মে ফিরে যেতে। দ্যাখো, আমি বড় মূর্খ মানুষ, তুমি জানো; আমি এই কথাটার অর্থ ঠিক বুঝতে পারিনি। আমি খানিক কথাটার চমকে আছি। নানা প্রশ্ন আসছে মনে; যেমন ধরো, তাহলে কি না-যাওয়াই শ্রেয় আমাদের শিকরের কাছে; ধর্ম কেবলই উপাচার, বা কেনই বা আজ এই ট্রেন্ড এসেছে ‘আমি নাস্তিক’ টাইপের, নাকি এখনও খানিক রস নেওয়া বাকি থেকে গেছে আমাদের আমাদেরই ধর্ম থেকে? আসলে আমি একে ধর্ম বলতে চাই না। এ এক জোট; মন এবং মননের জোট। আর এই জোট আমাদের অর্জন করতে হয়। আর হয়ত এই অর্জন করবার উপাসনাকেই ধর্ম বলো তোমরা। আর উপাসনা তো একক নয়, তার সাথে মিলেমিশে থাকে আমাদের কাম, বাসনা, লোভ। আসলে লোভই। পৃথিবীর সমস্তটাকে অধিকার করবার লোভ। অন্তরে অধিকার করার কথা বলছি না। এই অধিকার ক্ষমতার স্বাদ দেয়। আর যা কিছু আমরা অন্তরে অধিকার করি সে জোর দেয়। তাই অন্তর বাহিরের লড়াই থামে না। থামবেই বা কেন? লোভ সারাদিন কেবল ক্ষিপ্র হয়ে থাকে পাওয়া-কে নিয়ে, আর জোর মুচকি হেসে বলে, “ও আমি এমনিই পাবো, আমাকে হাত বাড়িয়ে, পেশি ফুলিয়ে পেতে হবে না”। তখন যে তৃষ্ণায় ফেটে যাবেই লোভ। তাই তো “রিফ্লেকশনস অন স্যালভেশন”। প্রশ্নের স্তরে-স্তরে প্রশ্ন, কেবল নিজেকেই এই প্রশ্ন। হ্যাঁ, আমি জোর দিয়েই বলছি আজ, ওই প্রশ্নগুলো কেবল নিজের জন্যই ছিল, পাঠক দূরের তারা। এ বই কেবল নিজেকেই পরতে-পরতে খুলে নতুন করে আবিষ্কার করা, এতে কোনও ধর্ম-বিরোধ নেই। এই বইয়ের প্রতিটি শব্দ অতিক্রম করলে, আমাদের শান্ত করবে, মনে করিয়ে দেবে কে আমি, কি করতে এসেছি। আর এই অশান্ত সময়ে শান্ত থাকাটাই উপাসনা। না, কেবল নিজেকে শান্ত করলেই আমার কাজ শেষ নয়। আমাদের কাজ সমস্ত উত্তপ্ত হৃদয়ের উপর ঠাণ্ডা হাতের তালু-খানা রেখে বলা, “চেতনায় ফিরে এসো। তুমি শান্ত না হলে তোমার ঈশ্বরের কান্না থামে না যে”! কিন্তু এ বলা সহজ, আর করা? সে যে শুনেছি মহামনিষীর কাজ। ব্যস, এটুকু বলেই খালাস আমরা। দায় শেষ আর কি! তাহলে লিখতে এসেছি কেন? ছবি আঁকা কেন এই বিরাট ক্যানভাসে? কেবল স্তুতি পাবে বলে? নাকি, এও এক ক্ষমতায়নের খেলা! কিরীটীদা, আমরাও কি তাহলে সেই পথেই চলবো? জীবন তার নিজস্ব পথ আর ‘শিল্প মহান’ এই শ্লোগান দিয়েই দিন কাটাবো? শব্দ স্থাপনা করা তো আমাদের পূজার ফুল, চিন্তা আমাদের উপাসনা, আর তুমিও তো বল, ভগবানের উপাসনায় কেবল ভালো চাইতে নেই, তাহলে খারাপগুলো যাবে কোথায়? আমরাও তো নীলকণ্ঠ হতে পারি! না হলে তাঁকে পাবো কোথায়? এত এত লোভ দিয়ে তাঁর আসন ভর্তি করে রাখলে তিনি স্থাপিত হবেন কোথায়?

এই দেখো, কথার ভাঁজে অন্য কোন রাস্তায় চলে গেলাম কে জানে? কথা ছিলো, তোমার কাজ নিয়ে কথা বলবো, কিন্তু… বাচালের ধর্ম! তার কেবল এলোমেলো রাস্তা হাঁটাই অভ্যাস। কান না ধরলে সে পথে আসে না! ফিরে আসি তোমার লেখায়। আমার আজও মনে আছে, অফিসে আসছি, হাতে রিফ্লেকশনের কপি, শেষ লেখা-খানা খোলা, চোখ রাস্তায়, রাস্তা আমাকে ছেড়ে পিছনে চলে যাচ্ছে, অনেকটা যেন চাদর টেনে আনার মত, সেই টানেই চলে আসতে থাকে “They say, God dwells within; it is then the mortal exploration of the resort where salvation is largely seen!”  ভাবছি, আমি আমার ভাষায় কেমন করে বলি একে! না, না, তখন অনুবাদের চেষ্টার কথা দূরদূরান্তে নেই। আমি কেবল অর্থ বুঝতে চাই, নিজের মতো করে, নিজের ভাষায়। “ঈশ্বরের বাস আমার মধ্যেই”। তাই তো সোহম! তবে কি তাঁকে নিজের মধ্যে খুঁজে পাওয়াই মুক্তি? না, শুধু তা কেন, তিনি সর্বত্র বিরাজ করেন, আসলে তাঁর সাথে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার নামই মুক্তি বলে মনে হয় আমার। যেমন একটা-একটা ইট জুড়ে মন্দিরের চূড়া হয়, তেমনই এই সংসারের সাথে জুড়ে-জুড়েই সেই চূড়ায় পৌঁছনো সম্ভব, এই সামান্য কথাটুকুই তো বলা সারা বইটা জুড়ে। এই সহজ কথাগুলোই তো বলা দরকার এখন, এই অশান্ত সময়ে। যখন উন্মাদনা, অসহিষ্ণুতা দরজা আটকে দাঁড়িয়ে, এমনই সময়ে সহজে অথচ এক ধাক্কায় তা খুলে ফেলাই তো মুক্তি। এইতো আমার সংস্কৃতি। সহজ, সরল, অবিচল। শুনেছি, একবার রবীন্দ্রনাথ সৃঙ্ঘল (শ্রীলঙ্কা)-এর এক নাচ দেখে ভারি আনন্দ পেয়ে তা ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন ‘চণ্ডালিকায়’। তবে ব্যবহার করবার সময় মূল নাচের উদ্দামতাকে বাদ দিয়ে তার স্নিগ্ধতাকেই রাখলেন। আসলে উদ্দাম যে উন্মাদনায় নিয়ে যায় তা আমাদের ভেতরের জানলাগুলোকে বন্ধ করে। অন্ধকার ফুঁসিয়ে তোলে। জাগিয়ে তোলে বহুকাল আগের অসভ্য জন্তুর গর্জন। নিজের সন্তানও তখন ভোজ্য হয়ে ওঠে।

কিরীটীদা, এসো আমাদের ঈশ্বরের কাছে আজ উপাসনার সময় ওই জানলাগুলোর জন্য আলো চেয়ে নিই। যুক্ত হওয়ার কষ্ট আছে। বহুদিনের বন্ধ দরজা খুলতে গেলে লাগে বৈকি, তবে না খুললে যে আমাদেরও মুক্তি নেই। আর কেবল নিজের মুক্তিও যে মিথ্যে সে তুমি বাবা হয়ে ভালোই জানো।

বিতান

১৭ এপ্রিল, ২০১৭

নিমতা, কলকাতা।

 

08eae9db7474f09724ea29b8441f3e00

যে লেখা চাওয়া হয়েছে

প্রিয় শুভদীপ,

তোমার প্রবল তাড়া পেয়েছি একটি লেখা জমা দেওয়ার জন্য। তুমি জানিয়েছিলে ‘সাহিত্য’ বিষয়ে কিছু একটা লিখতে। জানি না, আমায় কেন সাহিত্য নিয়ে লিখতে বললে? এ যে মানুষকে বলা স্বর্গ তৈরি করবার জন্য। আমি এই মহান দায় নিতে পারলাম না। তবে কিছু কথা বলি ‘যাপন’ নিয়ে। এ তোমার পত্রিকার জন্য প্রযোজ্য হবে কিনা তা ভেবে দেখার দায় তোমার। কারণটা তুমি জানো। আগের বারও একটি লেখা দিয়েছিলাম তোমারই অনুরোধে। তারপর আর যোগাযোগ করনি। না, তাতে আমার দুঃখ নেই। আমাকে জানাবারই বা কী আছে! আমি যা তোমায় দিলাম তার দায় তোমার। তুমি দায়িত্ব নিয়েছিলে সেটা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবে বলে। আমি তো সরাসরি পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারি না। তোমরাই আমার মাধ্যম। কাজেই এই লেখার দায়ও তোমার উপরেই ছাড়লাম।

বেশ কিছুদিন থেকেই ভাবছিলাম তোমায় কী বিষয়ে লেখা দেবো। শেষে ঠিক করলাম, তোমায় উদ্দেশ্য করে একটা চিঠি লিখি। বিষয় আমার প্রতিদিনের যাপন। দ্যাখো ভাই, আমি সন্ন্যাসী নই। আমি সাধনা করি না। আমি কেবল খোঁজার চেষ্টা করি,এই পৃথিবীতে আমার আসার পেছনে আসলে কি উদ্দেশ্য আছে? এবার তুমিও প্রশ্ন করতে পারো, “আরে বাবা, চেয়েছিলাম লেখা, তা না দিয়ে এই জ্ঞানগর্ভ পত্র কেন? আমার কী প্রয়োজন এই যাপন জেনে?” না, কারোর কোনও কাজ নেই জেনে। তবু লিখছি কারণ মাঝে মাঝে নিজেকেও তো নিজে দেখতে হয়! আয়নার মত করে। তাই এই চিঠি। ওই যে বললাম, তুমি পড়ে ফেলে দিতে পারো। আর আমি, তোমায় লেখা দিয়েছি বলে ভুলে যেতে পারি এই চিঠিটাকে, কথাগুলোকে কেবল মনে রেখে দিলাম।

দ্যাখো, আজকাল সাহিত্য লেখাটা যেন একটা নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সব্বাই লেখেন। আবার সকলেই ভালো লেখেন। খারাপ লেখেন না কেউই। কেউ পড়েন না। কেউ দেখেন না। পড়ি না আমিও। পড়বার সময় কোথায় বল? লিখতে সময় লাগে যে। আর, দেখা? নিজেকে দেখে দেখেই বেলা ফুরিয়ে যায়, আবার কি নতুন দেখার সময় বার করবো? আমি আজ ভাবতে বসেছি আমায় লিখতে হবে কেন? কোথায় মাথার দিব্বি দিয়ে এসেছি যে লিখতেই হবে? শোনো ভাই, আমি আজ জনসমক্ষে ঘোষণা করছি, আমি লেখক নই। আমি লিখি কেবলমাত্র নিজেকে স্পষ্ট করে দেখবার জন্য। তাই আমার লেখায় সময় লাগে বেশি। আরও সহজে বললে, আমি দেখতে চাই বেশি। কি দেখি? দেখি, কীভাবে রঘুদা ভ্যান চালিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর পায়ের পেশিগুলো ফুলে ফুলে ওঠে। দেখি, গেদে লোকালে ষাটোর্ধ বাদাম বিক্রেতার গলার স্বর নেমে আসে বেলা গড়াবার সাথে সাথে। দেখি, একজন লোক রাষ্ট্রের ভণ্ডামির খবর পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েন পাশের যাত্রীর কাঁধে। আর দেখি, প্রেমিক প্রেমিকারা হাত ধারাধরি করে দাঁড়ালেও অবিশ্বাস কোনও ঘ্রাণ নিতে দেয় না। আরও দেখি, জানো? যুবকের হাত ঘুষ নেয় রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে। এবার প্রশ্ন আসে, “এসব দেখে কী হয়?” দেখি, কারণ, আমিও তো এদের মধ্যেই আছি! আমার মধ্যে এরাও জীবিত। এই যে প্রতিটি মুহূর্তের মৃত্যু কিংবা জন্ম এও তো আমারই। আমার শরীর? সেও তো সমষ্টি। আমার আত্মা, আমার অনুভব–সে কি কেবল আমারই? তাহলে কেউ না শেখাতেই প্রথম হাসতে শিখলাম কীভাবে? আর কাঁদতে?

অনন্তকাল থেকেই বহু বহু মানুষের এইসব অনুভূতি জমেছে আমার মধ্যে। তাহলে আমি আলাদা হলেম কী করে? হ্যাঁ, আজও যেটুকু আমি দেখছি, জমাচ্ছি, সে সব দিয়ে যাব আগামীর জঠরে। এ কাজটি কি কেবল আমি বা আমরাই (যারা সাহিত্য লিখি) করে যাচ্ছি? তাহলে বিশ্বাস করতে হয় আমার মা-বাবা দুজনেই সাহিত্যিক। কিংবা, এই পৃথিবীর সকল পিতা-মাতাই লেখক। তাতো নয়, ভাই। তাঁরা খুব সাধারণ মানুষ। নিজেদের দেশ হারিয়ে অন্য দেশে এসে বসা বাসিন্দা। দুবেলা ছেলেপুলেদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারলেই খুশি। আর উৎসবের মাসে দুটো জামা-প্যান্ট। বেশ, আর কিছুই নয়। শব্দ লেখা তাঁদের কম্ম নয়। তাই তাঁরা আলাদা হতে পারেননি। আর এসবই আমরা যারা অস্বীকার করলাম তারাই সাহিত্য সৃষ্টি করতে এলেম! আহা, কি মজা!

আমি বিশ্বাস করি, এই গোটা পৃথিবী জুড়ে যে বিশাল কর্মকাণ্ড ঘটে চলছে আমি তার এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। যেমন বিশাল পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে নিচের সমস্ত কিছুকে ক্ষুদ্র লাগে তেমনই, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ আমি। যেমন ধরো, ইট। সে সকলের সাথে ইমারত তৈরি করে। আবার সে যখন ওই সমগ্রের থেকে বিচ্যুত হয় সে কেবল ‘রাবিশ’, বা জঞ্জাল। আমরা কেবলমাত্র নিজেদের সমস্ত কিছুর থেকে আলাদা করে নিয়ে নিজেদের শক্তি ক্ষয় করে চলেছি। এই বিচ্যুতিকে আমরাই কেউ কেউ তত্ত্ব লাগিয়ে বলে দিই, ‘ নিজেকে অনুসন্ধান করছি’। তারপর একদিন একলা হতে হতে গর্জে উঠে বলবো, ‘এ দুনিয়া আমাকে বুঝলো না’। দুনিয়া এর উত্তর দেয় না। কখনোই এর উত্তর দেয়নি সে। সমষ্টির থেকে বিচ্যুত পরমাণুকে নিয়ে ভাববার সময়ই যে তার নেই।

আমার এই বিচ্যুতির ভয় আছে। কারণ দুনিয়ার কাছে জবাব চাইতে আমার ভয় লাগে। ভয় লাগে, নিজেকে দৃষ্টিশূন্য করতে। আমি অন্ধ হলে, আমার আগামীও যে অন্তঃসারশূন্যই হবে।  ফলে আমার জন্য যেটুকু কাজ বরাদ্দ রয়েছে তাই করে যেতে চাই। আমার ঈশ্বর যেন সেটুকু শক্তি দেন আমাকে। আমার দৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখেন, যেন সর্বদা সচেতন থাকি ছানির হাত থেকে।

আমার শুভেচ্ছা নিও। ভালো থেকো।

বিতান

 

EGCO1.jpg

ঠাট্টা, আমি এবং মায়া…

ঠাট্টা করছেন? তা করুন। ঠাট্টা করার মতই কাজ বটে এটা। সত্যি কিনা! কি লজ্জার বিষয়! কি মিথ্যাই না এই ঘটনা! আরে আরে চটছেন কেন? আহা কেন বলবো না, কি হয়েছে? বলবো, বলবো। আপনার ভাঁড়ের চা জুড়িয়ে এলো যে! নিন চুমুক দিন। বলছি, আদতে কি হয়েছে।

ছেলেবেলায় কোথায় যেন পড়েছিলাম বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন এ পৃথিবীটা আসলে জীবের সরাইখানা। এক অনন্ত পথ হেঁটে এসে তারা বিশ্রাম নেয় এ শান্ত ছায়াময় সরাইখানাতে। সরাইখানার নাম দিতে হয়, তাই এই স্থান ‘পৃথিবী’। একদিন বিশ্রাম শেষে আবার রওনা হতে হবে সেই নির্দিষ্ট লক্ষের দিকে।

নানান প্রশ্ন আসে মনে। সেই প্রশ্ন করেছি আর কি! এ হেন অন্যায়! তাই সবাই ঠাট্টা করলে। চা খাইয়ে, চা খেতে বলে, একবার চা খাওয়াবে বলে ঠাট্টা জুড়ে দিলো। আচ্ছা আপনিই বলুন তো কি অন্যায় বলেছি? সরাই খানাই যদি হবে তাহলে এতো ‘পিরিত’ কিসের? এই গাছ লাগাও, বাড়ির পলেস্তারা খসে গেলো, রাস্তা সাড়াও, খানা-খন্দ ভরাও। আমি তো বাপু কখনও কোনও হোটেলে গিয়ে দেখি না ফুল গাছগুলো মরল কিনা, মেঝের টাইলস ফাটা কিনা, আরে দেখতে যাবো কেন? আমি কি শালা সারা জীবন থাকবো এখানে? তাহলে? এই ধরুন না, আমাদের পাড়ার গবাদা আর বাচ্চুদার মধ্যে খুব ঝগড়া। দুজনেরই অভিযোগ দুজনেই ওজনে মারে। ঝগড়া চলে। আমরা মেনে নিই, ব্যবসায় এসব হয়। কিন্তু তারাও তো পথিক। তবে? ঝগড়া কেন?

কি বললেন? হ্যাঁ, তা ঠিক। সত্যি তো এমনটা ভেবে দেখিনি। নানান শহর বেড়িয়ে এসে আমারও তো চাই আমার শহরের এই জিনিষটা ওই শহরের মত হোক। পাহাড় বেড়িয়ে এসেই একখানা বড় পাহাড়ি ছবি টাঙিয়ে রাখি শোওয়ার ঘরের ঠিক মুখ বরাবর। আসলে আমরা সেই স্থানের মায়াটা বহন করে আনি। আর রেষারেষি লাগে তখনই যখন সেই শ্রেষ্ঠ মায়াকে অধিকার করতে হয়। তাই দলে দলে ঝগড়া লাগে। হিংসে করি। যাইহোক আসল কথাটা তাহলে হলো যে জন্য বৌদ্ধরা এই গপ্প ফেঁদে ছিলো তা তো আসলে মায়ার ফাঁদে না পড়ার জন্য, তবুও এই গল্প গলে আমরা ফাঁদে পরেই যাই।

আচ্ছা এই মায়া, এই দৃশ্য, এই শব্দ তাকি কেবলই ‘আমার’? এর জন্মদাতাও কি আমি? যে দৃশ্য আমি দেখি বা শিল্পী ক্যানভাসে নামিয়ে আনে সেই দৃশ্যও কি ‘আমার’ আবিষ্কার করা? যে আবেগ, যে অনুভূতি নিয়ে আমরা মুগ্ধ হই, সাহিত্যের পাতা ভরে ওঠে তাও কি কেবলই ‘আমার’? কেউ আর কখনও দেখেনি এই দৃশ্য, কখনও মুগ্ধ হয়নি সেই আবেগে, অনুভূতিতে! কেন জানি না আমার বিশ্বাস আমি কেবল, অনন্তকালের এই দৃশ্য, এই মুগ্ধতা কে বড় সৌভাগ্যক্রমে অনুভব করতে পারি। আর মায়া সেও আমার পরম সৌভাগ্য, যে তা আমাকে ধরা দেয়। থাকুক, সেই মায়া থাকুক। আপনারা ঠাট্টা করলেও সেই মায়ায় থাকি, অনন্তকালের সাথে মিলতে আর লজ্জা কি! আর আপনারা না হয় নিজেরাই এক ‘কাল’ রচনা করুন।

 

abstract-art-joy-of-life-lotus-flower

একটা ঘর বাঁধার গল্প

দুশালিখ’-এর হঠাৎ একদিন দেখা হলো একটা নদীর ধারে। অথচ তাদের দেখা হওয়ার কোনও কথা ছিলো না। একজন শালিখ সারাদিন সারাদুনিয়ার মানুষকে শিখিয়ে বেরায় ‘ত্বকের যত্ন নিন’, আর রাতের বেলা টুকটুক করে গুছিয়ে রাখে নিজের ‘বসা-বাটি’। অন্য শালিখের মন থাকে না বাসায়। ঘুরে বেড়ায় আনাচকানাচ। কে কোথায় কি সুরে গান গায়, কার চোখ কি কথা বলে যায় চকিতে, কে কত রং মেখে নেয় ফ্যাকাসে গালে। আর সে তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে ওঠে। সে কোন ঘর খুঁজে পায় না, তাই সে তা সাজানোর স্বপ্নও দেখে না। সে স্বপ্ন দেখে এমন একটা ঘর বাঁধবে কারোর মনে, যে ঘর বানে ভেসে যায় না। নদীর পাড়ে যখন দেখা হয়েছিলো দুজনের, প্রেমিক শালিখ সেই ঘর বানাবার খড় জোগাড় করা শুরু করেছিলো আর প্রেমিকা শালিখ বাসা-বাটির জন্য সুগন্ধ কুড়িয়েছিলো সেদিন। তারপর সারারাত একটু একটু করে খড় বেঁধে বেঁধে ছাদ ছাওয়া শুরু, সুগন্ধ মিশে যায় রাতের মিহি হাওয়ায়। সারারাত জোনাকিদের সাথে জ্বলে থাকে দুজনার ছোট ছোট স্বপ্ন। পরদিন ভোর হয়। কাজ এসে ধুয়ে দিয়ে যায় রাতের আবেশ। কারও কারও ত্বক হয়ে ওঠে কালচে, কারও মনের রং ফ্যাকাশে হয়ে যায়, দৌড় তুমুল দৌড়। স্বপ্ন ফুটপাথে বসে থাকে অনাথ শিশুর মত। আবার রাত আসে স্বস্তি নিয়ে। আবার জ্বলে ওঠে জোনাকির আলো। ঘুম আসে স্বপ্নের সাথে। তবে আজকাল আর স্বপ্নে রামধনু খেলে না, নিদেনপক্ষে মেঘলা নদীর পাড়ের হাওয়াও নিয়ে আসে না, আজকাল খালি দৌড়, আর দৌড়।

romantic-teddy-day-facebook-photos

হায়রে ব্যাপক, হোয়রে ব্যাপক… ফ্যান হয়ে গেছি…

fan-story_647_110615112549

 

এসো ভাঙো। কথায় বলে না ভাঙলে কিছু গড়া যায় না। আপনি নিজেকে কতটা ভাঙতে পারবেন তার উপর ডিপেন্ড করবে আপনার গড়ে তোলা ইমারতের স্থায়িত্ব। আর স্থায়ী ইমারত কেউই বা চায় না! সে আপনার পাড়ার সান্টুদাই হোক বা শাহরুখ খানই হোক। আরে বাবা এরা কেউই তো আর এলিয়েন নয়, মানুষ।

২০১৫ তে “দিলওয়ালে” রিলিজ করবার পর শুধু বক্সঅফিসই নয় ফ্যান অফিসেও যে বিশাল ধস নেমেছে তা কিন্তু শাহরুখ খান নিজেও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। না হলে সারা ভারতের ডিস্ট্রিবিউটদের লোকসান কমাবার জন্য নিজের কোম্পানির থেকে অর্ধেক টাকা মেটানোর দায়িত্ব নিতেন না। আর সুপারস্টারেরা জানেন কীভাবে তাদের ফ্যান আর ইমেজ ধরে রাখতে হয়! ঠিক আপনি যেমন জানেন বাড়ির প্রিয় লোকটা থেকে শুরু করে পাড়ায় আপনার ইমেজ কিংবা অফিসে বসের মন কিভাবে যুগিয়ে চলতে হয়! আপনিও জানেন, আজ আপনি যা সেটা আপনার এই আশেপাশের মানুষগুলোর জন্যই। আর তার জন্যই তো আপনার প্রিয় মানুষগুলো আপনার ‘ফ্যান’। আর ফ্যানদের কুক্ষিগত করতে যে কোনো পর্যায়েই যেতে পারেন শাহরুখ খান, এটা বুক বাজিয়ে দেখিয়েও দিলেন। ২০০-৩০০ কোটি টাকার বাজার ছেড়ে, আইসল্যান্ড ছেড়ে, গ্রিসের শানদার লোকেশন ছেড়ে, দিল্লীর অলি-গলি আর মুম্বইয়ের সিনেমা নিয়ে পাগলামিকে হাতিয়ার করে নেমে পড়লেন সারা দুনিয়ার কয়েক শো কোটি ফ্যানদের দুর্গ অটুট রাখতে।

আমি জানি না এই রিস্ক এযাবৎ আর কোনও সুপারস্টার নিয়েছেন কিনা নিজের স্টারডমকে ধুলোয় লুটিয়ে ফের আকাশে তুলে নেওয়ার খেলায়। যেমন কিছুদিন আগে নিয়েছিলেন অংশুমান খুরানা “দম লাগাকে হেইসা” ছবিটির কাজ হাতে নিয়ে। যদিও অংশুমানের সেই স্টার-ভ্যালু নেই। তবু চকোলেট বয় ইমেজে অমন মোটা নায়িকার সাথে প্রেম করবার দুঃসাহস তিনি দেখিয়েছিলেন। হয়ত সিনেমা সমালোচকগণ বলবেন, অংশুমানের কিছু হারাবার নেই। আমি ফ্যান দেখে এসে বলবো শাহরুখ খানেরও হারাবার যে আর কিছু নেই তা তিনিও বুঝে গেছেন। তাই এই ঝুঁকি নিতে পেরেছেন।

একটা কথা বলে রাখি। এই লেখার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু ফ্যান-এর রিভিউ লেখা নয়। ফলে মূল গল্প আমি বলবো না। যদি না দেখে থাকেন ভরসা করতে পারেন, দেখে আসুন, ১৪০ টা মিনিট নষ্ট হবে না। তবে হ্যাঁ, প্রেমিকা নিয়ে যাবেন না। কারণ সিনেমা চলাকালীন তার কাঁধে মাথা রাখার বা একটু চুমু খাওয়ার ইচ্ছেটাই আপনার চলে যেতে পারে। তারপর হলের বাইরে এসে আপনার চুপচাপ মুখ দেখে যদি তিনি তিনদিন কথা না বলেন তার দায় কিন্তু আপনার। আমাকে দায়ী করবেন না।

একজন অভিনেতার কাছে চ্যালেঞ্জ থাকে, প্রতিদিন নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করবার। শোনা যায় অভিনেতারা নিজেকে খুঁজে বের করবার জন্য নানান উপায় অবলম্বন করেন। কেউ অবসরে সারাটা দিন কাটান মেকআপ রুমে। নিজেই নিজের মেকআপ করতে করতে খুঁজতে থাকেন নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নতুন কোনো মুখ। কেউবা ঘুরে বেড়ান একেক প্রান্তে, বিভিন্ন মানুষের মধ্যে, খুঁজে বেড়ান নিজের নতুন সত্তা। ফ্যান দেখতে দেখতে হঠাৎই ইচ্ছে হল জানবার, শাহরুখ খান কী করে খুঁজে পেলেন গৌরবকে? শুধুই আধুনিক মেকআপ? অত্যাধুনিক প্রযুক্তি? ওঁর স্টারসুলভ হাঁটাচলা, কথা বলার ধরণ, টিপিকাল দিল্লীর পাঞ্জাবী টানে হলের মধ্যেও কেউ কেউ বলে উঠলেন, “এ সত্যিই কী শাহরুখ খান?” আবার অন্যদিকে, সেই চেনাজানা স্টার SRK। সিনেমা জুড়ে সমান সমান এই দুই সত্তা। সিনেমায় কিছু আজগুবি দৃশ্য আছে বটে; যেমন অবলীলায় কয়েক মাইল দৌড়ানো, বিশাল উচ্চতা থেকে থেকে লাফালাফি করে মারাপিট, এইসব আর কি! আফটারঅল, বাণিজ্যিক ছবি, বাবা রামদেবও যেখানে প্রোডাক্ট বেচতে নকল রঙের ব্যবহার করে সেখানে শাহরুখ খানের দোষ দিয়ে লাভ কী?

ফ্যান-এর বাণিজ্যিক সাফল্য কী হবে সেটা অদূর ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু এই সিনেমা যে শাহরুখের ইমারত ভারতীয় সিনেমার জমিতে শক্ত-পোক্ত করে তুললো তা আমি হলফ করে বলতে পারি। আর শেষ কথাটা ভাই, ফ্যান দেখে কালই আমার একবন্ধুকে বলছিলাম, এবার থেকে দুটো কথা চলবেই বন্ধুদের মধ্যে, ‘রয়ন দে, তু নেহি সমঝেগি’, আর ‘… হায় রে ব্যাপক, হোয়রে ব্যাপক ফ্যান হয়ে গেছি’। সে বললো যদি না চলে? আমি কথা দিয়েছি, যদি আগামী বছর পর্যন্ত এই দুটো সংলাপ না চলে আমি “দিলওয়ালে”র থেকেও খারাপ একটা গল্প লিখবো নিজের দায়িত্বে।

নিজের পানে চাইতে মানা! (প্রথম পর্ব)

একবার আমাদের স্কুলের বাংলা স্যর হঠাৎ করে ক্লাস শেষ করে বিশাল ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দিয়ে গেলেন, “মনকে চারিদিক থেকে উদ্‌বোধিত করো।’’ উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র হওয়ায় ‘উদ্‌বোধিত’ শব্দের মানেটা জানতাম। কিন্তু পুরো বাক্যের অর্থ মাথার উপর দিয়ে বাউন্স করেছিলো। লাইনটা পড়ে প্রথম রিঅ্যাকশান ছিলো, আমার মনতো চারিদিক থেকেই খোলা, কই দেওয়াল তো দেখি না! এইতো, গহরস্যার যখন পড়িয়ে গেলেন মেঘনাদ বধ কাব্যে রাবণের পিতৃরূপ তাও মনে ঢুকল, আবার তপন বাবুর জটিল ইনরগ্যানিক কেমিস্ট্রির ক্যালকুলেশন গুলোও। তারও মাঝে মনে ঢুকে গেলো গতকাল কোন একবন্ধুর নতুন প্রেমিকা পাওয়ার (পড়ুন পটানো) গল্পও। এতদ্বারা প্রমাণিত যে আমার মন চারিদিক থেকে ‘উদ্‌বোধিত’!

তারপর কয়েকমাস কাটিয়েই কলেজ। গোলটা বাঁধলও তখনই। কলেজ ক্যান্টিনে একদল দাড়ি- গোঁফ ওয়ালা ছেলে বিক্রি করলো একখানা পত্রিকা। প্রথম পাতায় নজরুলের কোটেশন, যা আমার মত করে সরল করে নিলে হয়, একদল মানুষ এসে মন্দির ভাঙল, তখন কালি এসে বাঁধা দিলে না, এমনকি আকাশ থেকে কোনও বজ্রও নেমে এলো না এই অকল্যাণের মাথায়। আবার কিছু মানুষ যখন মসজিদ ভাঙলেন আল্লাহও যথারীতি চুপ। এই কথাটা আমাকে খুব চঞ্চল করে তুললো। আমিও বিপদে ঈশ্বর জপেছি তার কয়েক মাস আগেই। ‘ঠাকুর অঙ্কটা উৎরে দাও, তোমার পুজো দেবো!’ উৎরে গিয়ে, মহান ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছি, কথা রাখতে সক্কালবেলা দক্ষিণেশ্বর গেছি পুজো দিতে। তবে? যে মহাশক্তি আমার সামান্য অঙ্কের সমস্যা মীমাংসা করে দিতে পারেন নিমেষে, সে কিনা তার নিজের অতবড় অনিষ্ট মেনে নেয় বিনা বাঁধায়। এ বোধ তো কখনো উদ্বোধিত হয়নি আমার মনের মধ্যে? তবে কি একটা বড়সড় দেওয়াল থেকে গেছে মনের মাঝখান বরাবর? খোঁজ খোঁজ রব পড়ে গেলো সমস্ত মন জুড়ে। মনস্তাত্ত্বিকেরা বলেন নিজেকে চিনতে নিজের আয়নার সামনে দাঁড়াতে হয়। আমি আমার আয়না হিসেবে বেছে নিলাম শব্দ। শব্দ আমার মধ্যে এক এমন জাল তৈরি করল, তার ফাঁস আজও আলগা হলো না। যাইহোক, শব্দ যে কেবলই জাল বুনলো না, সে নিজেকে নিজের সামনে দাঁড় করালো উলঙ্গ করে। এত দেওয়াল, এত দেওয়াল নিজের মধ্যে!! আর সেটা নিয়েই এত গর্ব? এমন সাহিত্যসেবক হয়ে লাভ কি? যে শব্দ ইতিহাসের প্রতিটি পাতাকে লেখে তার সাথে প্রবঞ্চনা? যে বিশালের মধ্যে এসে আমার এত অহংকার, তার সাথে শঠতা… না এ অসম্ভব। এরপর এক প্রবল বিশ্বাস জন্মালো যে শব্দ আলো দেখায় না, উদ্ভাবিত করে না আমার মনকে তা মিথ্যে। কারণ?

আরও একটা গল্প বলি, শুনুন। সালটা ২০১৩, আমার মনে এক অদ্ভুত রোগ দেখা দিলো। যার নাম ‘মন খারাপ’। রোজ সকালে চোখ মেলেই আমি আমার সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিতাম, আরও একটা দিন আমাকে বেঁচে থাকবার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। সারাদিন সমস্ত কিছুকে দুচোখ ভরে দেখতাম। যদি কাল না আর দেখা হয় এদেরকে! এক মহা বেদনা আমাকে মোচড় দিয়ে যেতো সঙ্গে সঙ্গে। এমনই একদিন সকালে উঠে ভাবলাম আজ একটু আমার জমানো বইগুলোকে দেখে নেওয়া যাক। হাতের সামনে পাওয়া বইটা উলটে পালটে দেখতে দেখতে চোখ আটকালো একটা চ্যাপ্টারে, নাম “মৃত্যু ও অমৃত”। লেখক স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আমাদের এই চলে যাওয়ার ‘বেদনা’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, আসলে আমরা আমাদের চারিপাশে কেবলমাত্র ‘আপনাকেই’ স্থাপনা করি। আর যখন ওই ‘চলে যাওয়ার’ বা ‘শেষ হওয়ার’ বেদনা এসে চেপে ধরে তখনই আমাদের মনটা খালি বলে ওঠে ‘এটা আমার, এটা আমার তৈরি করা, আর একে ছেড়েই আমাকে চলে যেতে হবে?’ ‘আসলে আমরা চারিপাশে কেবল আপনাকেই স্থাপনা করে গেছি’।

স্থাপনা করা কি তাহলে খারাপ? না, আসলে এই স্থাপনা আমাদের অহংকার। এই স্থাপনা আমাদের মনকে কোথাও উদ্‌বোধিত করে না। আর সাহিত্যচর্চা আমাদের এই স্থাপনার বাইরে নিয়ে যায়। কিন্তু মাঝেমাঝেই আজকাল পাঠক প্রশ্ন করেন, সত্যিই কি তাই? “আপনারা আজকের সাহিত্যকর্মীরা এই স্থাপনার বাইরে এসে সাহিত্য লেখেন?” এক পাঠকের এই প্রশ্নের সামনে আমি খানিক বিচলিতই হয়ে পড়ি। না, আমরা সত্যি সেটা প্র্যাকটিস করি না। এ নিয়ে, আবারও একটা ঘটনা বলি, একবার আমার এক কবি বন্ধুর সাথে বেশকিছুদিন ধরেই বিবাদ চলছিল, শিল্পীর কাজ ও তার জীবন এক হয় কি না তা নিয়ে। আমার বন্ধুর বক্তব্য এক নাও হতে পারে। সে যেটুকু সময় শিল্পকর্মের সাথে থাকছে সেটাই তার সততা। এর বাইরে এসে সে যদি তার জীবনকে কাজের (কাজ এখানে শিল্পীর দর্শন) বাইরে নিয়ে চলে যায়, সেই স্বাধীনতা সে নিতেই পারে। এ কথা আমার বিশ্বাস হলো না। শেষমেশ আমরা স্থির করলাম,  এই বিবাদের মীমাংসা করবো কবি শঙ্খ ঘোষের কাছে। স্যরের কাছে এক রোবাবর সক্কালবেলা গিয়ে উপস্থিত হলাম। স্যর স্মিত হেসে ব্যপারটা উপস্থাপিত করলেন উপস্থিত আরও কিছু অধ্যাপক ও শিল্পীদের মধ্যে। তারাও এককথায় মেনে নিলেন যে আমার বন্ধুর কথাই ঠিক। যুক্তি দিলেন, শিল্পে যা সত্যি তা বাস্তবিক জীবনে প্রয়োগ করা খুব কঠিন। আজকের দিনকালে এভাবে চলা যায় নাকি! সব শুনে স্যার যথারীতি আবার স্মিত হাসলেন, বললেন, শিল্প ও জীবন এক হওয়াটাই কাম্য তবে সবাই তা পারেন না। স্যর বিশদে কিছু বললেন না। বলবার কথাও নয়। শম্ভু মিত্র বলতেন, কেউ সবটা বলে দেবে না। বলবে এইটুকু, বুঝে নিতে হবে এতোটা। কিন্তু মূর্খ আমি। ছুটলাম সুপ্রীতি মুখোপাধ্যায়-এর কাছে। টালিগঞ্জ মোরে সবে সন্ধ্যে নেমেছে। সুপ্রীতিকাকু, প্রশ্ন শুনে একটু থমকালেন। ধীরে বললেন, সেই চেষ্টাই তো করছি রে। তবে এখনো পেরে উঠিনি। বড় কঠিন এ পথ। সন্ধ্যের আবছা আলোয় যেন কাকুর চোখের কোনটা একটু চকচক করে উঠতে দেখলাম।

পথ কঠিন। হ্যাঁ তা বটে। তবে কিনা এই কঠিনের সাধনাই মানুষের। মানুষ কখনই কাছের পাওয়া কে নিয়ে চিন্তিত ছিলো না। থাকলে সে কখনো আগুন জ্বালতো না। ধাতু গলিয়ে তৈরি করতো না হাতিয়ার। বানাতো না সভ্যতা। আর আমাদের শিল্প-সাহিত্য সেই সভ্যতার দলিল। দুরকে কাছে পাওয়ার এক মাধ্যম। কিছু ভুল বললাম। ও হ্যাঁ, ভুল করছি। আমরা শিখেছি শিল্প-সাহিত্য কেবল বিনোদনের এক মাধ্যম। আমরা শিল্পী সাহিত্যিকেরা আসলে পাফরমিং আর্টিস্ট। যেমন ধরুন শাহরুখ খান। আপনাদের খুব একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করছি, আপনারা কেউ প্রেম করেন? প্রেমিকার সাথে জাস্ট একটা রোমান্টিক মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার জন্য সুইজারল্যান্ড গেছেন, নিদেন পক্ষে মেরিন ড্রাইভ। শাহরুখ খান জান। সিনেমায়। হতে পারেন তিনি সিনেমায় গ্যারেজের ম্যাকানিক বা চাকরী প্রার্থী। তাতে ক্ষতি কি। তিনি যে আমাদের লার্জার দ্যান লাইফের হিরো। এই ল্যার্জার দ্যান লাইফের মানেটা কি? এর মানে, আমার আপনার দিন-দৈন্যতার থেকে বহু ক্রোশ দুরের একটা শহর। আসলে এটা একটা ইচ্ছে। যেটা আপনার বা আমারও করতে ইচ্ছে করবে। করেও ফেলি। অহেতুক বিতণ্ডা প্রিয় বুদ্ধিজীবীরা যাকে বলেন পন্যায়ন, আর মিডিয়া বলে মশলা!

Lantern